×

অটিজম

আ. স. ম. ওয়াহিদুজ্জামান ০১:৫২ মিঃ, সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৮ Views : 959

অটিজম একপ্রকার  স্নায়ুর বিকাশজনিত সমস্যা যাতে শিশুর সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত হয়। এতে শিশু বারবার একই আচরণের পুনরাবৃত্তি করতে থাকে এবং আচরণগত সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়। অভিভাবকরা সাধারণত শিশুর জন্মের দু’বছরের মাঝে এই অস্বাভাবিকতা ধরতে পারেন। এর উপসর্গসমূহ প্রায়ই খুব ধীরে প্রকাশ পায়। অনেক সময় শিশুর পূর্ণ বিকাশ হয়ে যাওয়ার পর এ সমস্যা দেখা যেতে পারে। গবেষকদের মতে এটি প্রধানত বংশগত। তবে পরিবেশগত প্রভাবকও এ রোগের কারণ হিসেবে বিবেচিত। জন্মগত ক্রটির কারণেও এ সমস্যা হতে পারে। যদিও এ রোগের কোন নিশ্চিত প্রতিকার নেই তবু তাড়াতাড়ি এ রোগ নির্ণয় করে দ্রুত স্পিচ ও বিহেভিয়েরাল থেরাপি দেয়া সম্ভব হলে তা শিশুর বিকাশে অনেক উপকার করে। 

মেয়েশিশুর থেকে ছেলেশিশুরা প্রায় ৪/৫ গুন বেশী এতে আক্রান্ত হয়। ২০১৩ সালের হিসেবে বিশ্বে প্রায় ২১.৭ মিলিয়ন শিশু অটিজমে আক্রান্ত যা দিন দিন বেড়েই  চলেছে।

অটিজমের লক্ষণ 
অটিস্টিক শিশু দেখতে একদম স্বাভাবিক শিশুর মতো। তাদের কোন সুস্পষ্ট শারীরিক বা স্নায়বিক ক্রটি পরিলক্ষিত হয় না। এ কারণেই প্রাথমিক পর্যায়ে এ রোগ নির্ণয় করা কঠিন। শিশু যখন স্কুলে যায় তখন এটা অনেকটা স্পষ্ট হয়ে উঠে। যখন অন্যান্য সমবয়সীদের সাথে মিশতে পারে না, তাদের মতো আচরণ করে না তখন তার মানসিক অনগ্রসরতা ধরা পড়ে। 

অটিজমের প্রধান উপসর্গই হল মানসিক বিকাশের বিলম্ব বা অস্বাভাবিক। জন্মের প্রথম তিন বছরের মধ্যে সাধারণত নিম্নের লক্ষণ সমূহ দেখা যায়ঃ-
সামাজিকতা বা অন্যের সাথে যোগাযোগ স্থাপনে অক্ষমতা
১. কারো দিকে চোখে চোখে তাকায় না। অর্থাৎ আই কনটাক্ট করে না। বরং কেউ তাকালে চোখ ফিরিয়ে নেয়।

২. নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয় না। কারো কাছে আসে না। আশেপাশের লোকজনের প্রতি আগ্রহ দেখায় না। ঘরে কেউ আছে কি নেই, কে আসলো, কে কী করছে সেদিকে কোন আগ্রহ থাকে না। একাকী স্থানে সম্পূর্ণ আত্মনিমগ্ন অবস্থায় থাকে।

৩. অর্থপূর্ণ সামাজিক হাসি হাসতে পারে না। অর্থহীনভাবে হাসে। সঠিকভাবে আবেগ প্রকাশ করতে পারে না।

৪. কোন কিছুতে মনোযোগ দিতে পারে না। কেবল নিজের পছন্দের জিনিসে, অর্থহীন বিষয়ে মনোযোগ থাকে। 

৫. সমবয়সী বা ছোট বড় কারো সাথেই মিশতে পারে না। নিজস¦ একটা জগতে সবসময় একাই থাকে। কোন ধরণের সামাজিক আদান-প্রদান ও সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে না। 

৬. কোনরুপ অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারে না। অন্যের সাথে আনন্দ-অনুভূতি উপভোগ করতে পারে না।

বয়সানুসারে ভাষাগত অক্ষমতাঃ 

১. কোন কথা বলতে বা বুঝতে পারে না।
২. অনেকে কথা বলতে পারলেও কোন প্রশ্ন উত্তর দেয় না। অনেকে যন্ত্রের মতো কথা বলে।
৩. অনেকে অপর জনের কথা পুনরাবৃত্তি করে। একই কথা বারবার বলে। অর্থহীন কথা বা শব্দ বারবার বলতে থাকে।

বিকাশের ধারা অনুযায়ী সিম্বলিক বা কাল্পনিক খেলার অক্ষমতা
১.    খেলা বা খেলনার প্রতি কোন আকর্ষণ থাকে না। আনমনে একা একাই খেলা করে। খালি বোতল,বোতাম, সুতো, তার, প্যাকেট নিয়ে অর্থহীন দীর্ঘসময় ব্যয় করে। কোন জিনিস দিয়ে দীর্ঘক্ষণ একটা কিছু তৈরী করে এরপর তা নষ্ট করে, আবার তৈরী করে। একাই হাসে।
২.    যে কোন খেলনার কোন নির্দিষ্ট অংশ যেমন গাড়ির চাকা নিয়ে অধিক ব্যস্ত থাকে। কোন খেলনা সামগ্রিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না। 
৩.    নিজে উদ্যোগী হয়ে অন্য শিশুদের সাথে খেলতে যায় না। এমনকি অন্য শিশু আগ্রহী হলেও সে সাড়া দেয় না। 
৪.    কল্পনাপ্রসূত কোন কাজ বা খেলা সে পছন্দ করে না। যেমন একটি পুতুলকে শিশুর মতো আদর করা বা একটি কাঠের টুকরোকে গাড়ি মনে করে চালানো বা খেলনা পাতিলে রান্না করা ইত্যাদি করতে পারে না। 
 
নেগেটিভ স্টেরিও টাইপ আচরণ 
১. বারবার যেমন একই কাজ করে, এমনি অন্যদেরও বারবার একই কাজ করতে জোরাজুরি করে । 
২. পরিবেশের কোন পরিবর্তন সে মেনে নিতে চায় না। একই খাবার,একই জামা,একই পরিবেশ না হলে বিরক্ত হয় বা রেগে যায়।
৩. মুখে অদ্ভুত শব্দ করে বা একই অঙ্গভঙ্গি বারবার করে। অন্যমনস্ক হয়ে নিজের হাত বা আঙুল নিয়ে নিবিষ্টমনে নাড়াচাড়া করে। চোখের সামনে এনে দেখে,আবার নাড়ায়। 

অটিস্টিক শিশুকে অনেকসময় শান্ত ও ভদ্র শিশু মনে করা হয় কারণ তারা কোন কিছু খাওয়ার জন্য, প্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য স¦াভাবিক শিশুর মতো বায়না করে না। সে অন্যের হাত ধরে এনে কাক্সিক্ষত বস্তুর দিকে দেখিয়ে দেয়। নিজ হাতের আঙুল দিয়ে কিছু দেখায় না।

মা-বাবার আদর সে প্রত্যাখান করে, স্নেহ এড়িয়ে যায়। তাকে কোলে নিতে চাইলে সে আগ্রহী হয় না। কেউ তাকে স্পর্শ  করলে সে খুব বিরক্তবোধ করে। 

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিশু তার মা-বাবাকে চিনে না। নিজস্ব ব্যক্তিসত্তা বলতে তার কিছু থাকে না। এরা কারো সাথেই সদ্ভাব তৈরী করতে পারে না। স্বাভাবিকভাবে তিনমাস বয়সেই শিশু তার মাকে চিনতে পারে। কিন্তু অটিস্টিক শিশু তা করতে পারে না।

এই শিশুরা এতো বেশি সংবেদনহীন থাকে যে অনেকে তাদের বধির বা শ্রবণপ্রতিবন্ধী বলে ভুল করে। শিশুর পঞ্চইন্দ্রিয় সম্পূর্ণ সুস্থ থাকা সত্তে¦ও তারা ইন্দ্রিয়ের সঠিক ব্যবহার করতে পারে না। 

জড়বস্তু বা মানুষের মাঝে তারা কোন পার্থক্য বোঝে না। পৃথিবীর কোন কিছুতেই তার কোন আকর্ষণ নেই। তারা মানুষ থেকে প্রাণহীন যে কোন কিছুর প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে যেমন-চাবির গোছা,বাক্স,তার,ঝুড়ি,সুইচ,কাপড় বা যন্ত্রপাতি। প্রাণহীন বস্তুর প্রতি আকর্ষণ থাকে এবং তার সাথে সম্পর্ক তৈরীতে ব্যস্ত থাকে। অথচ মানুষের সাথে সম্পর্ক তৈরীতে বিন্দুমাত্র উৎসাহিত হয় না।

ঘরের সাধারণ খাবার সে খেতে চায় না। কিন্তু রিচ ফুড, জাঙ্ক ফুড,কেক,পেস্ট্রি,চকোলেট,আইসক্রিম ইত্যাদির প্রতি আকর্ষণ থাকে।

ধৈর্য্য ও মনোযোগ অনেক কম। তাই এদের কিছু শেখানো খুব কঠিন। এরা সহজে কিছু শিখতে পারে না। এদের মনোযোগ আকর্ষণ করাটাই অনেক কঠিন। অনেক সময় নিয়ে, ধৈর্য ধরে শেখাতে গেলেও খুব উপকার হয় না। ফলে মা-বাবা হতাশ হয়ে যায়। ব্যক্তিগত কোন কাজ এরা নিজেরা করতে পারে না। 

এসব ছাড়াও আরও অনেক উপসর্গ হতে পারে। তবে সব শিশুর মধ্যে সব লক্ষণ দেখা যায় না। সাধারণত জন্মের তিন বছরের মধ্যেই এসব লক্ষণ প্রকাশ পায়। এ ধরনের যে কোন লক্ষণ দেখা গেলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করা আবশ্যক।