বিশ্বব্যাপী শিশুর বৃদ্ধির সচেতনতায় বিভিনড়ব কার্যক্রম পালিত হয়। আমাদের দেশেও ইদানিং বহির্বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে কিছু জনসম্পৃক্ততামূলক কর্মসূচি গৃহীত হচ্ছে। উল্লেখ্য, শিশু বৃদ্ধির সচেতনতায় প্রতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘গ্রোথ এ্যাওয়ারনেস ডে’। জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (নিপোর্ট) তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশ ছেলে-মেয়ে দৈহিক বৃদ্ধির ঘাটতিজনিত সমস্যায় আক্রান্ত । এ বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা হলে প্রকৃত অবস্থা জানা যেতে পারে। পৃথিবীব্যাপী বাড়ন্ত শিশুর বৃদ্ধিজনিত সমস্যা দৃশ্যমান। বিশ্বব্যাপী এ সংখ্যা প্রায় ২.৫ শতাংশ।
বৃদ্ধিজনিত সমস্যাগুলোকে বিভিনড়বভাবে ভাগ করা হয়। তবে শিশুর বিশেষ বয়সের সাথে তার বৃদ্ধি যদি একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে কম হয় তাহলে তার বৃদ্ধিজনিত ঘাটতি রয়েছে ধরে নেওয়া হয়।
কারণগুলো:
* দীর্ঘস্থায়ী রোগ (জেনেটিক ত্রুটিসহ)
* বংশগত বৃদ্ধি ঘাটতি
* হরমোনজনিত সমস্যার কারণে বৃদ্ধি ঘাটতি
দীর্ঘস্থায়ী রোগজনিত বৃদ্ধি সমস্যা :
যে সব শিশু খুব ছোটবেলা থেকে দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত হয় যেমন- যক্ষ্মা, হাঁপানি, ম্যাল অ্যাবসোরপশন
(Malabsorption) সিনড্রোম বা খাদ্য শোষণ ও পরিপাকজনিত সমস্যা, দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া, হেপাটাইটিস
সিনড্রোম ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হয়, তাহলে তাদের বৃদ্ধি নিশ্চিতভাবে কাক্ষিত পরিমাণে হয় না। আবার যাদের ছোটবেলা থেকে রোগের কারণে পুষ্টির ঘাটতি হয় তাদেরও বৃদ্ধি সঠিক হবে না।
জিন ও ক্রোমোজোম ত্রুটিজনিত সমস্যাসমূহের মধ্যে ডাউন সিনড্রোম, টার্নার সিনড্রোম প্রধানত চোখে পড়ে। তবে আরও কিছু সমস্যা আছে। সিস্টিক ফাইব্রোসিস নামক জিনগত ত্রুটি শ্বাসতন্ত্রকে আক্রান্ত করে, যা বৃদ্ধি ব্যাহত করে থাকে।
বংশগত বৃদ্ধি ঘাটতি :
পরিবারের শিশুর বৃদ্ধি কাঙ্খিত হারে হচ্ছে না এমন অভিযোগ নিয়ে যে সব অভিভাবক আসেন সে সব শিশুর সকলেরই যে বৃদ্ধি সঠিকভাবে হচ্ছে না তা নাও হতে পারে। কারণ একেকজনের দৈহিক বৃদ্ধির হার বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন রকম থাকে। আমাদের কাছে যখন শিশুর অভিভাবকরা তার ছেলে-মেয়ের অসন্তোষজনক বৃদ্ধির সমস্যা নিয়ে আসেন তখন আমরা তার পরিবারে অন্য সদস্যদের বৃদ্ধির হার দেখার সাথে সাথে তার সমবয়সীদের সাপেক্ষে বৃদ্ধি বেশি-কম সেটাও দেখার চেষ্টা করি। যেমন দেখা হয়, বৃদ্ধির হার কি সাম্প্রতিককালে কমেছে না বরাবরই কম ছিল? তারপর শিশুর বৃদ্ধির ঘাটতিজনিত সমস্যা মূল্যায়ন করতে
গিয়ে তার শারীরিক গঠন, খাদ্যাভ্যাস, পারিবারিক বৃদ্ধি সংক্রান্ত ইতিহাস, দীর্ঘসূত্রি রোগের ইতিহাস নেওয়া হয়।
কারও কারও পরিবারের সদস্যদের প্রায় সবারই বৃদ্ধির ধীরগতি থাকে, আবার কারও সাময়িক বামনত্ব মনে হলেও তার শেষ পর্যন্ত কাঙ্খিত দৈহিক বৃদ্ধি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।যাদের কোনো রোগ আছে তাদের সেগুলো নিশ্চিত হয়ে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। যাদের জেনেটিক ত্রুটি আছে তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসাটা বেশ জটিল ও ব্যয়বহুল হয়।
হরমোনজনিত সমস্যা :
আবার হরমোনজনিত বেশকিছু কারণ বৃদ্ধি ঘাটতির জন্য দায়ী। গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি স্পষ্টতই বৃদ্ধি ঘাটতির কারণ হতে পারে এবং সেক্ষেত্রে যে কোনো সময় ঘাটতি শুরু হওয়ার পর পরই বৃদ্ধি ব্যাহত হবে। কম বয়সীদের ক্ষেত্রে যদি গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি থাকে তা শনাক্ত করে চিকিৎসা করতে
পারলে ফলাফল খুবই আশাব্যঞ্জক।
গ্রোথ হরমোন ঘাটতিজনিত রোগ নির্ণয় পদ্ধতি, চিকিৎসা ও ফলোআপ বাংলাদেশে হরমোন বিশেষজ্ঞ (এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট) দক্ষতার সাথে করে আসছেন। কিন্তু গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি থাকলে চিকিৎসা কিছুটা ব্যয়বহুল হয়। আবার টার্নার সিনড্রোম রোগীদেরও গ্রোথ হরমোন দিয়ে চিকিৎসা করতে হয়।
গ্রোথ হরমোন ঘাটতি থাকলে প্রাপ্ত বয়সেও তার গ্রোথ হরমোন ইনজেকশন নিতে হতে পারে। এ রকম একজন বিখ্যাত লোক হলেন- লিওলেন মেসি, যিনি ১৬ বছর বয়সে বার্সেলোনায় এসে গ্রোথ হরমোন ঘাটতির চিকিৎসা নেন। যাদের পুষ্টিহীনতার কারণে বৃদ্ধি ঠিকমতো হচ্ছে না তাদের অল্প বয়সে পুষ্টির সংশোধন হলে বৃদ্ধির উনড়বতি হতে পারে। কিন্তু প্রাপ্ত বয়সে সংশোধন হলেও লাভ নেই। অল্প বয়সে শনাক্ত হলে বেশিরভাগ
ক্ষেত্রেই চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়।
কিন্তু বাংলাদেশের মতো আয়োডিন ঘাটতি এলাকার মানুষের জনবসতিতে ছেলে-মেয়েদের বৃদ্ধি ঘাটতি অন্যতম কারণ হল থাইরয়েড হরমোনের স্বল্পতা (হাইপোথাইরয়েডিজম)। হাইপোথাইরয়েডিজমে শারীরিক বৃদ্ধির সাথে মানসিক বৃদ্ধিও ব্যাহত হয়। পৃথিবীর সকল উনড়বত দেশ তাদের সন্তানদের জন্মের পরবর্তী কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা জেনে নেয়। কেননা, মেধাবী জাতি পেতে হলে অতি অল্প বয়স থেকেই শরীরে থাইরয়েড হরমোনের আদর্শ মাত্রা থাকা উচিৎ। এ দেশের খাটো মানুষদের অনেকেই ছোটবেলা থেকে থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতিতে আক্রান্ত ছিল। আর দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসা করলে তাদের স্বাভাবিক দৈহিক বৃদ্ধি অর্জন নিশ্চিত করা যেতো। একই সাথে মেধারও বহিঃপ্রকাশ ঘটতে পারতো।
তাই অভিভাবক বা আত্মীয়স্বজন পরিবারের নতুন সদস্যদের বৃদ্ধির প্রতি সচেতন দৃষ্টি রাখবেন। সন্দেহ হওয়া মাত্র শিশু বিশেষজ্ঞ/অনেক ক্ষেত্রে হরমোন বিশেষজ্ঞদের শরণাপন্ন হবেন। তাতে অনেক সংশোধনযোগ্য বৃদ্ধি ঘাটতি সমস্যা তড়িৎ সমাধান করে ছেলে-মেয়েদের দৈহিক স্বাভাবিক বৃদ্ধির সুযোগ অর্জন করা যেতে পারে।



.jpg)

.jpg)






