×

থাইরয়েডের সংগে বসবাস এবং এর থেকে উত্তরণ

নাজনীন নাহার, লেখক ও সাংবাদিক ০৪:৩৯ মিঃ, জুলাই ১৭, ২০২১ Views : 1509

গত ক’টা মাস সকালে ঘুম থেকে উঠলেই ভীষন ক্লান্ত লাগে, মনে হয় আবার ঘুমিয়ে থাকি। ক্লান্তি ভাবটা কাটাতে সময় লাগে। অথচ আমার দশটায় অফিস, বাসার রান্না, ছেলের স্কুল সবইতো সকালেই করতে হয়, হাঁপিয়ে পড়ছিলাম খেয়াল করছিলাম ত্বকের আর্দ্রতা আর চুলের রুক্ষতা ক্রমশই বাড়ছিল, কেমন যেন ভালো লাগছিলো না। মেজাজটাও আস্তে  আস্তে খিটমিটে হয়ে যাচ্ছিল, কার্যকারনে দুশ্চিন্তা গ্রস্থতা  বাড়ছিল, খেই হারিয়ে ফেলছিলাম দৈনন্দিন কাজের। খাওয়া দাওয়া স্বাভাবিকই ছিল, ডিম খাওয়া বাড়ালাম কিন্তু কাজ হচ্ছিল না। সকালে কফি বা চাখাওয়ার আগ পর্যন্ত কোন কাজই করতে পারছিলাম না। বিষয়টা ক্রমশই দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছিল। আবার তেমন কোন অসুস্থতা নেই, এসিডিটির সামান্য সমস্যা। আর ডাক্তার বলেছিল ফ্যাটি লিভার, তাই দুধ জাতীয় খাবারের প্রতি ছিল নিষেধাজ্ঞা। মেনেই চলছিলাম কিন্তু কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছিলাম,না ওজনটাও একটু একটু করে বাড়ছিলো। বেশী খারাপ  লাগতো  সকাল  বেলাটা।  মনে  হতো  জোর করে  শরীরটাকে টানছি। আমার বড় বোন ডাক্তার তাই ওকে জানালাম ও বলল থাইরয়েডের লেভেল পরীক্ষা করতে। পরীক্ষা করালাম TSH, FT4, FT3 এবং থাইরয়েড এন্টিবডি পরিক্ষার ফলাফল স্বাভাবিক মাত্রা হতে বেশী। অর্থাৎ স্বাভাবিক ভাবে এর মাত্রা ৪.৫ থেকে ১০ MLU/L (মিলি ইউনিট প্রতিলিটারে) সেটা আমার পাওয়া গেল ২১ MLU/L অর্থাৎ বেশী এর মানে আমার থাইরয়েড গ্রন্থি শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় পরিমানে হরমোন তৈরি করতে পারছেনা। এটাকে ডাক্তারী ভাষায় বলা হয় হাইপোথাইরয়ডিজম (Hypothyroidism)।

রিপার্ট দেখে ডাক্তার জানালেন আমার আমার সকল উপসর্গ এবং অবসাদগ্রস্থ’তা আর ক্লান্তির কারন হাইপোথাইরোডিজম এবং তিনি আমাকে থাইরক্স ট্যাবলেট ২৫ মিলিগ্রাম করে সকালে খালি পেটে খাবার পরামর্শ দিলেন। সাথে খাবার গ্রহনে কিছু বিধিনিষেধ, বলেন ভয়ের কিছু নেই তবে এটা মেনে লতে হবে এবং নিয়মিত পরীক্ষা করে ঔষধের মাত্রা নির্ধারন করে খেয়ে যেতে হবে। নিয়মিত পরিক্ষা করানোটা কতটা জরুরী তা এখন আমি জানি কারন গত ২ বছর ধরে আমি থাইরক্স খাচ্ছি, কখনো ২৫ মিঃ গ্রাম করে, কখনো ৫০ মিঃ গ্রাম করে এবং কখনো কখনো একদিন বাদ দিয়ে দিয়ে। ঔষধ গ্রহনের এই ভিন্ন মাত্রা একজন চিকিৎসক দ্বারাই নির্ধারন করা হয়। নিয়মিত ২-৩ মাস কোন কোন ক্ষেত্রে ৬ মাস পর পর রক্ত পরিক্ষা করে টি এইস এস (TSH) এর মাত্রা রোগীভেদে কিংবা (TSH এর সাথে T3 T4 এর মাত্রার পরিমান দেখে ঔষধের মাত্রা নির্ধারন করতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে শতকরা ৭১% রোগীই নিয়মিত এই পরীক্ষা করান না। ফলশ্রুতিতে একই মাত্রায় ঔষধ সেবন করে যান। দীর্ঘদিন বা একটা সময় পরে ঔষধ খাওয়া বন্ধ করে দেন। এর দু’টোই এই রোগের জন্য ক্ষতিকর। অতিরিক্ত মাত্রায় ঔষধ সেবন হরমোনের মাত্রাকে অনিয়ন্ত্রিত করে তোলে ফলে শারীরিক অসুস্থতা বৃদ্ধি পায়। হঠাৎ করে ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত ঔষধ বাদ করে দিলে টি এইচ এস এর মাত্রা কমে বা বেড়ে যেতে পারে। কোনমতেই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ঔষধ বাদ করা বা মাত্রা বাড়ানো কমানো উি ত নয়। সাথে নিয়মিত পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। এতো গেলো ঔষধের কথা আরেকটা গুরুত্বপূর্ন বিষয় হলো নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এবং শরীরচর্চা যা আমার ব্যাস্ত জীবনে মেনে চলা এবং করাটা কতটা সহজ হবে তা ভেবেই খারাপ লাগা শুরু হলো কিন্তু কিছু করার নাই, তাই শুরু করলাম থাইরয়েডের সাথে বসবাস করার প্রস্তুুতি। প্রথমে জানার চেষ্ঠা কেন এটা হলো বা আসলে থাইরয়েড কি?

দেশে প্রতি ৮ জন নারীর মধ্যে একজনের থাইরয়েডের সমস্যা রয়েছে সুতরাং দেশে এ রোগে ভুগছেন এমন রোগীর সংখ্যা সহজেই অনুমেয়। তবে মজার ব্যাপার হলো এদের মধ্যে ৭৯ % রোগীই ভালো করে জানেন না থাইরয়েড আসলে কি? এটা হলে কি হয় এবং কিভাবে এটা হতে মুক্তি লাভ করা যায় বা সুস্থ থাকা যায়। এর পেছনে অনেক কারন রয়েছে। অন্যতম প্রধান কারন হলো তথ্যলাভের সহজলভ্যতা এবং গণসচেতনতা। আমাদের চিকিৎসকের আন্তরিকতার অভাবও রয়েছে যথেষ্ঠ। একজন রোগীকে সচেতন করার চেয়ে আরেকজন রোগী দেখার বিষয়টিই গুরুত্বপূর্ন। তবে কিছু কিছু হাসপাতাল বা চিকিৎসা কেন্দ্রে এ বিষয়ে গণ কাউন্সিলিং এর ব্যবস্থা আছে যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ক্রমবর্ধমান এই রোগ নিয়ন্ত্রণে সে তনতা অতীব জরুরী। কারন এর ফলাফলের ভয়াবহতা হেলা করার মত নয়। মানুষের কর্মক্ষতার সাথে এই রোগ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাছাড়া মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও এর যথেষ্ঠ প্রভাব রয়েছে। মনে রাখতে হবে দক্ষ এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী যেকোন দেশের জন্য আশীর্বাদস্বরুপ।

থাইরয়েড কি?

থাইরয়েড আমাদের শরীরের গলার সামনে অবস্থিত একটি গ্রন্থি’র নাম। এটি থাকে আমাদের গলার স্বরযন্ত্রের দুই পাশে। এই গ্রন্থি’র কাজ হল আমাদের শরীরের কিছু অত্যাবশ্যকীয় হরমোন উৎপাদন করা যা নিঃসৃত হয়ে আমাদের বিপাক ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং শরীরের স্বাস্থ্যকর ওজন ও শক্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদি কোন কারনে এই গ্রন্থির হরমোন নিঃসরণে কোন প্রকার ব্যতিক্রম হয় তখন এটি বিভিন্ন রোগ ঘটাতে সক্ষম। যা থাইরয়েডের সমস্যাজনিত রোগ হিসাবে পরিচিত। আমাদের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার থেকে অতিরিক্ত পরিমানে হরমোন উৎপাদিত এবং নিঃসৃত হলে যেমন সমস্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম হলেও সমস্যা।

থাইরয়েড গ্রন্থি’ সাধারণত দুই ধরণের হরমোন নিঃসরণ করে।

১.  ট্রাই-আয়োডোথাইরোনিন (T3)

২.  থাইরক্সিন(T4)

থাইরয়েড জনিত সমস্যাগুলো যা যা হতে পারে

বাচ্চাদের ক্ষেত্রে জন্মের সময় এইগ্রন্থি ঠিকভাবে তৈরি না হলে কিংবা প্রয়োজনমত হরমোন তৈরি করতে না পারলে বাচ্চাদের শারীরিক এবং মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয় কেননা বাচ্চাদের ক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখে। একজন শিশু যদি ছোট বেলা থেকে এর অভাবে ভোগে তাহলে সে প্রতিবন্ধী হয়ে বড় হবে। যদি তাকে চিকিৎসা দেওয়া না হয়। সে বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে যাবে। এছাড়া আমাদের শরীরে যতটুকু হরমোন প্রয়োজন তার চেয়ে কম কিংবা বেশি পরিমাণে এই হরমোন তৈরি হলে তখন নানা রকম সমস্যা দেখা দেয়। প্রয়োজনের তুলনায় কম পরিমাণে এই হরমোন তৈরি হলে হাইপোথাইরয়ডিজম হতে পারে। আবার প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পরিমাণে এই হরমোন উৎপন্ন হলে হাইপারথাইরয়ডিজম হতে পারে। উভয়ই আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

এছাড়াও উক্ত গ্রন্থি’তে আরো বিভিন্ন রকমের রোগ হতে পারে। সাধারণত বেশি হয় এমন কিছু রোগ নিয়ে আলো না করা যাকঃ

. হাইপোথাইরয়ডিজম(Hypothyroidism)

. হাইপারথাইরয়ডিজম(Hyperthyroidism)

. গয়েটার(Goiter)

. নডিউল(Nodule)

. থাইরয়েড ক্যান্সার(Thyroid Cancer)

. গ্রেভস ডিজিজ(Graves diseases)

হাইপোথাইরয়ডিজম(Hypothyroidism):

এই রোগ অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক সময়ে ধরা পড়ে না। থাইরয়েড হরমোনজনিত রোগের লক্ষণগুলো এতটাই বৈচিত্র্যময় হয় যে খুব সহজেই তা চিকিৎসকদের সন্দেহকেও এড়িয়ে যায়। তাই কিছু উপসর্গ আছে যা দেখে আপনি নিজেই সন্দেহ করতে পারবেন হয়তো আপনি হাইপোথাইরয়েডিজম এ ভুগছেন এবং চিকিৎসকের শরনাপন্ন হতে পারবেন। থাইরয়েড গ্রন্থি যদি প্রয়োজনের তুলনায় কম হরমোন উৎপাদন করে তখন হাইপোথাইরয়ডিজম হবার সম্ভাবনা আছে। যদিও অনেক সময় এর চোখে পড়ার মত লক্ষণ দেখা যায়না, যার ফলে অনেকে বুঝতেই পারেন না তারা হাইপোথাইরয়ডিজম এ আক্রান্ত। থাইরয়েডে আক্রান্ত রোগীর মধ্যে ৬৭% ই হাইপোথাইরয়েডিজমে ভোগে। এই রোগে ভোগা মানুষের মধ্যে ৮৭% এরই উপসর্গ ছিল ক্লান্তি কিংবা অবসাদ অনুভব করা, কোনো কিছুতে মনোযোগ দিতে না পারা, শুষ্ক ত্বক এবং অল্পতেই শীত শীত লাগবে। তবে হাইপোথাইরয়ডিজম হলে সাধারণত যে লক্ষণগুলো দেখা যায় তা হলঃ

. ক্লান্তি কিংবা অবসাদ অনুভব করা

. কোনো কিছুতে মনোযোগ দিতে না পারা।

. শুষ্ক ত্বক

. কোষ্ঠকাঠিন্য

. অল্পতেই শীত শীত লাগবে

. পেশী এবং বিভিন্ন জয়েন্টে ব্যথা অনুভূত হবে।

. বিষন্নতা থাকবে

. মহিলাদের ক্ষেত্রে ঋতুস্রাবের সময় অতিরিক্ত পরিমাণ রক্তক্ষরণ হতে পারে।

. পালস রেট কম থাকতে পারে স্বাভাবিক এর তুলনায়।

হাইপারথাইরয়ডিজম(Hyperthyroidism) :

এক্ষেত্রে হাইপারথাইরয়ডিজম এর উল্টো ঘটনা ঘটে। থাইরয়েড গ্রন্থি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হরমোন উৎপাদন করলে হাইপারথাইরয়ডিজম হবার সম্ভাবনা থাকে। থাইরয়েড গ্রন্থিকে নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি নামক এক গ্রন্থি’। মস্তিষ্কের এই পিটুইটারি গ্রন্থি কে আবার নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস নামক অংশ। এই হাইপোথ্যালামাস থাইরয়েড রিলিজিং হরমোন(TRH) নামক এক হরমোন নির্গত করে। এই TRH হরমোন এর কাজ হল পিটুইটারি গ্রন্থি’ কে থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন(TSH) নামক এক হরমোন নির্গত করার জন্য সংকেত পাঠানো। এই TSH হরমোন উক্ত গ্রন্থি’কে থাইরয়েড হরমোন নির্গত করার জন্য সংকেত পাঠায়। বোঝা গেল তাহলে এই হরমোন উৎপাদন এর জন্য শুধুমাত্র থাইরয়েড গ্রন্থি দায়ী নয়। হাইপোথ্যালামাস, পিটুইটারি গ্রন্থি’ এবং থাইরয়েড গ্রন্থি’র মিলিত প্রচেষ্টায় হরমোন নির্গমণ কাজ সম্পন্ন হয়।

এখন উক্ত ৩ টি গ্রন্থি’র যে কোনো একটি বা একাধিক গ্রন্থি যদি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কাজ করে ফেলে তখন ফলাফল হিসেবে যতটুকু হরমোন দরকার তার চেয়ে বেশি পরিমাণ হরমোন উৎপন্ন হয়। আর তখনই বাঁধে সমস্যা। যেটা হাইপারথাইরয়ডিজম নামে পরিচিত। এ রোগে ভোগা ৭৮% লোকেরই উপসর্গ ছিল অতিরিক্ত ঘাম এবং গরম সহ্য না করতে পারা সেই সাথে পালস রেট বেড়ে যাওয়া। হাইপারথাইরয়ডিজম হলে সাধারণত যে লক্ষণগুলো দেখা যায়ঃ

. অতিরিক্ত ঘাম

. গরম সহ্য না করতে পারা

. হজমে সমস্যা

. দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ বেড়ে যাওয়া।

. অস্থিরতা অনুভব করা।

. ওজন কমে যাওয়া

 . পালস রেট বেড়ে যাওয়া

. ঠিকমত ঘুম না হওয়া

. চুল পাতলা এবং ভঙ্গুঁর হয়ে যাওয়া

. ত্বক পাতলা হয়ে যাওয়া

. মহিলাদের ক্ষেত্রে ঋতুস্রাব অনিয়মত কিংবা খুব অল্প পরিমাণে হওয়া।

. বয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রে হৃদস্পন্দন বেড়ে যেতে পারে। খুব খারাপ অবস্থা হলে এবং হাইপারথাইরয়ডিজম এর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না নেয়া হলে থাইরয়েড স্টর্ম(Thyroid Storm) হতে পারে। এতে রোগীর রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে, জ্বর আসতে পারে এবং হৃদস্পন্দন বন্ধও হয়ে যেতে পারে।

গয়েটার(Goiter):

এছাড়াও থাইরয়েড গ্রন্থি’টিই বড় হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে একে গয়েটার(Goiter) বা গলগন্ড বলা হয়ে থাকে। যেহেতু গ্রন্থি’টি হরমোন তৈরির জন্য আয়োডিন এর প্রয়োজন পড়ে। সেহেতু আয়োডিনের অভাব হলে গ্রন্থি’টি হরমোন তৈরি করতে পারেনা ঠিকভাবে। তবুও এটি চেষ্টা করে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় হরমোন তৈরি করতে। ফলস্বরূপ এটি নিজে বড় হয়ে যায় শরীরের হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে এবং একটা সময় এটি আর পারেনা সেই স্বাভাবিক মাত্রায় হরমোন তৈরি করতে। ফলে হরমোন এর পরিমাণ কমে যায় প্রয়োজনের তুলনায়। এবং ফলাফল হিসেবে উক্ত ব্যক্তি হাইপোথাইরয়ডিজম এ আক্রান্ত হয়। এজন্য যেসব শিশু বা মানুষ আয়োডিন এর স্বল্পতায় ভুগে তাদের এই রোগ হবার সম্ভবনা বেশি থাকে। তবে বর্তমানে লবণের সাথে আয়োডিন গ্রহণের ফলে এই রোগের প্রাদুুর্ভাব অনেকাংশেই কমে এসেছে।

নডিউল(Nodule):

এছাড়া এইগ্রন্থিতে টিউমার ও হতে পারে। যাকে নডিউল(Nodule) বলে। এক্ষেত্রে এই টিউমার সংখ্যায় এক বা একাধিক হতে পারে। এবং বিভিন্ন আকারের হতে পারে। তবে টিউমার হলেই সবক্ষেত্রে ক্যান্সার হয়না।তবে অবস্থা বেশি খারাপ হলে এবং কোনো চিকিৎসা না নেয়া হলে এটি ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। যাকে বলা হয় থাইরয়েড ক্যান্সার।

Anti-thyroid anti-body: রক্তে Anti-thyroid anti-body এর উপস্থিতির অর্থ রোগী Hashimoto's এবং গ্রেভস রোগ এ আক্রান্ত। Hashimoto's এমন এক রোগ যেখানে পুরো থাইরয়েড গ্রন্থি’টিই ধীরে ধীরে আক্রান্ত হয়ে যায়।

এছাড়া আরো কিছু পরীক্ষা যেমন নিউক্লিয়ার থাইরয়েড স্ক্যান, থাইরয়েড আল্ট্রাসাউন্ড, কম্পিউটারাইজড এক্সিয়াল টোমোগ্রাফি স্ক্যান (Computerized Axial Temography Scan) এর মত কিছু পরীক্ষার সাহায্যে ও থাইরয়েড গ্রন্থি’র বিভিন্ন রোগ সনাক্ত করা যায়।

রোগসনাক্তকরণঃ

থাইরয়েড এর বিভিন্ন রোগসনাক্তকরণে সাধারণত নিচের পরীক্ষাগুলো করা হয়ঃ

রক্তপরীক্ষাঃ

রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে হরমোনের মাত্রা পরীক্ষা করা যায়। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে সাধারণত নিচের টেস্টগুলো করতে হয়ঃ

Thyroid Stimulatiing Harmone (TSH): এই পরীক্ষায় রক্তে TSH এর মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। রক্তে TSH এর মাত্রা কম হলে বুঝতে হবে হাইপারথাইরয়ডিজমে রোগী আক্রান্ত। আর বেশি হলে হাইপোথাইরয়ডিজমে

আক্রান্ত।

Thyroxine Harmone(T4): রক্তে উচ্চমাত্রার T4 এর উপস্থিতির অর্থ হাইপারথাইরয়ডিজম আর নিম্নমাত্রার T4 এর উপস্থিতির অর্থ হাইপোরথাইরয়ডিজম।

Tri-iodothyronine Harmone(T3): রক্তে উচ্চমাত্রার T3 এর উপস্থিতির অর্থহাইপারথাইরয়ডিজম আর নিম্নমাত্রার T3 এর উপস্থিতির অর্থহাইপোথাইরয়ডিজম।

TSH receptor antibody (TSI): রক্তে TS এর উপস্থিতির অর্থ রোগী গ্রেভস রোগ এ আক্রান্ত। এই রোগে চোখের চারপাশ ফুলে উঠে।

থাইরয়েডেরচিকিৎসা:

রোগের ধরন এবং অবস্থাভেদে আমাদের দেশে সাধারনত বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা বিদ্যমান থাকলেও ট্যাবলেট সেবন এবং সার্জারির প্রচলন বেশী। এই সব রোগীকে প্রতি দিন থাইরয়েড হরমোন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে খেতে দেওয়া হয়। টিএসএইচ ও এফটি-ফোর এর মাত্রা রক্তে কেমন আছে সেটির উপর ভিত্তি করে থাইরয়েড হরমোন এর ডোজ নির্ধারণ করা হয়। এই ওষুধ ট্যাবলেট আকারে বাজারে বিভিন্ন নামে পাওয়া যায়। এই ওষুধটি প্রতিদিন সকালে খালিপেটে খাওয়ার ৩০ মিনিট আগে খেতে বলা হয়। যে সব খাবার খেলে হাইপোথাইরয়েডিজম হতে পারে সেগুলি থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। চিকিৎসা শুরু করার ছ’সপ্তাহ থেকে ছ’মাস অন্তর পুনরায় এফটি-ফোর এবং টিএসএইচ মাত্রা দেখা হয় এবং এদের পরিমাণ ঠিক রাখার জন্য থাইরয়েড হরমোনের ডোজ বাড়ানো বা কমানো হয়। নিয়মিত ওষুধ খেলে হাইপোথাইরয়েডিজম রোগ দূরে রাখা সম্ভব। আয়োডিনের অভাবে হাইপোথাইরয়েডিজম হয়ে থাকলে রোগীকে আয়োডিনযুক্ত নুন ও অন্যান্য আয়োডিন পরিপূর্ণ খাবারও খেতে বলা হয়। রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকলে কিছু ওষুধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। হাইপারথাইরয়েডিজেমের রোগীকে থাইরয়েড হরমোন কম তৈরি করার জন্য মেথিমাজেল, কার্বিমাজোল ইত্যাদি ওষুধ দেওয়া হয়। কিছু দিন পর রক্তে টি-থ্রি, টি-ফোরের পরিমাণ কমে যায় এবং রোগীর উপসর্গগুলি আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হয়।

সার্জারি:

হাইপারথাইরয়ডিজম, গয়েটার এবং নডিউল কিংবা টিউমার হলে সেটির ক্ষেত্রে রোগের মাত্রা অনুযায়ী থাইরয়েড গ্রন্থির কিছু অংশ কিংবা পুরোটা কেটে ফেলতে হতে পারে অপারেশানের মাধ্যমে।

তবে ৭০ ভাগ ক্ষেত্রে এই গ্রন্থি’র অর্ধেক কেটে ফেললেও রোগী তার বাকি অর্ধেক দিয়ে স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে পারে। তবে যাদের পুরো গ্রন্থিটই কেটে  ফেলেতে হয় তাদের বাকি জীবন আলাদাভাবে বাহির থেকে প্রয়োজনীয় হরমোন গ্রহণ করতে হয়।

অন্যান্য পদ্বতি:       

বুক ধড়ফড় কম করার জন্য বেটা-বøকার ব্যবহার করা হয়। এই সব চিকিৎসায় রোগ নিয়ন্ত্রণে না এলে রেডিও আয়োডিন দিয়ে থাইরয়েড গ্রন্থি’কে ধ্বংস করে দেওয়া হয় অথবা অস্ত্রোপাচারের মাধ্যমে এই গ্রন্থ’টিকে বাদ দেওয়া যেতে পারে। এছাড়া বিভিন্ন নিউক্লিয়ার মেডিসিন, তেজস্ক্রিয় আয়োডিন ব্যবহার করে আক্রান্ত হবার মাত্রা নির্ধারণ করে চিকিৎসকেরা পরবর্তী পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

সুতরাং কোনো লক্ষণ দেখলে সেটাকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। আর সুস্থ থাকতে বছরে অন্তত একবার রক্ত পরীক্ষা করে থাইরয়েড গ্রন্থি’র অবস্থাচে ক করতে পারেন।

চিকিৎসা সাবধানতা:

হাইপোথাইরয়েডিজমে চিকিৎসা হলো থাইরয়েড হরমোন। এবং এইচিকিৎসাযেকেউই করতে পারে। একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, একজন এন্ড্রোক্রাইনোলজিস্ট এবং একজন নিউক্লিয়ার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। এটা সবাই করতে পারে। এখানে নিউক্লিয়ার মেডিসিনের আলাদা করেকোনো ভূমিকা নেই। তবে যখন হাইপারথাইরয়েডিজমের বিষয়টি আসে, সেখানে নিউক্লিয়ার মেডিসিনের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। হাইপারথাইরয়েডিজম বিভিন্ন রকমের হয়, হাইপার থাইরয়েডিজমের চিকিৎসা হচ্ছে অ্যান্টিথাইরয়েড ওষুধ। যেটি থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতাকে কমিয়ে দেবে। ওষুধের পাশাপাশি সার্জারি করা যেতে পারে। যেহেতু গ্রন্থি’টিবেশি কাজ করছে, তাই কিছু অংশ কেটে কার্যকারিতা কমিয়ে দেওয়া যেতে পারে এবং রেডিও আয়োডিন থেরাপি, আমরা নিউক্লিয়ার মেডিসিনে ব্যবহার করি। এর ভূমিকা খুবই ভালো। যখন অ্যান্টি থাইরয়েড ওষুধ ব্যবহার করা হয়, এটি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেড় থেকে দুই বছর ব্যবহার করা হয়। তার পর এই ওষুধ তাকে বন্ধ করে দিতে হবে। রোগী যদি স্বাভাবিকথাকে, খুব ভালো কথা, তবে যদি আবারও হয় এই ওষুধ দিয়ে তাকে চিকিৎসা করার কোনো সুযোগ নেই। রেডিও অ্যাকটিভ আয়োডিন দিয়ে হাইপারথাইরয়েডিজমের ভালো চিকিৎসা হয়।

কিভাবে থাইরয়েড রোগ রক্ত শর্করা প্রভাবিত করে?

থাইরয়েডের রোগটি রক্ত গুকোজ পরিচালনা করতে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, হাইপারথোয়েডিজম সহ, থাইরয়েড হরমোনের প্রচুর পরিমাণে বিপাক বৃদ্ধি পায়। এই ঔষধ, যেমন ইনসুলিন হিসাবে প্রক্রিয়া হতে পারে এবংস্বাভাবিক থেকে শরীর থেকে আরও দ্রুত নির্মূল করতে পারে। হাইপারথাইরয়েডিজমের সাথে নির্ণয় করা টাইপ ১-এর মতো কিছু লোকের জন্য থাইরয়েড হরমোনের স্থিরত্ব না হওয়া পর্যন্ত ইনসুলিনের উচ্চ মাত্রা গ্রহণ করতে হবে।বিপরীত হাইপোথাইরয়েডিজম সত্য, যেখানে বিপাক মন্থর হয়। ইনসুলিন শরীরের বেশিরভাগ সময় রক্তে শর্করার উচ্চতর ঝুঁকির কারণ হতে পারে (হাইপোগ্লাইসিমিয়া)। আপনার ডাক্তারের সাথে আপনার অবস্থা নিয়ে আলো না করার আগে পর্যন্ত আপনার থাইরয়েডের রোগের ক্ষতিপূরণদেওয়ার জন্য আপনি আপনার নির্ধারিত ইনসুলিনের ডোজ নিয়ন্ত্রণ করবেন না।থাইরয়েড নিঃসৃত হরমোন রক্তে বেশি হলে বা কমলেইনসুলিনের সংবেদনশীলতা কমে যায়। ফলে ডায়াবেটিস হতে পারে। যেহেতু হাইপোথাইরয়েডিজম বেশি পরিমাণদেখা যায় হাইপারথাইরেয়ডিজেমের থেকে, সে জন্য সচারচর আমরা ডায়াবিটিসের সঙ্গে হাইপোথাইরয়েডিজেমের চিকিৎসা করি। এ ছাড়া, গ্রেভস হাইপারথাইরয়েডিজেম এবং টাইপ-১ ডায়াবেটিস যেহেতু একটি অটো ইমিউনি ডিমিক অনেকক্ষেত্রে এক সঙ্গে দেখা যায়।

থাইরয়েড ও মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকে?

১.  হাইপোথাইরয়েডিজমের লক্ষণের সঙ্গে মানসিক অবসাদের মিল রয়েছে- এর ফলে মানসিক বিষন্নতা, ক্লান্তি, মনঃসংযোগ ব্যাহত হওয়া, সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা, খিদে কমে যাওয়া এবং ওজন বৃদ্ধির মতো সমস্যা হতে দেখা যায়। অন্যদিকে, হাইপারথাইরয়েডিজমের সঙ্গে মানসিক উদ্বেগের লক্ষণগুলোর মিল রয়েছে, যেমন- উচ্চরক্ত চাপের সমস্যা এবং হৃদস্পন্দনের মাত্রা বেড়ে যাওয়া।

২. থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যহীনতার ফলে মহিলাদের শরীরে বাহ্যিক পরিবর্তন ঘটে, যেমন- ওজন বৃদ্ধি, মুখমন্ডলেলোমের পরিমাণের আধিক্য বা চোখের প্রসারণ বা চোখঠেলে বেরিয়ে আসা প্রভৃতি, যা আবার দৈহিক ভাবমূর্তিজনিত সমস্যার সৃষ্টি করে।

যদি কারোর লাগাতার হাইপারথাইরয়েডিজমের সমস্যা থাকে তাহলে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দেয়-

. ডিসফোরিয়া (জীবনেরসববিষয়েইঅসন্তুষ্টি)

. উদ্বেগ

. খিটখিটে ভাব

. মনঃসংযোগ ব্যাহত হওয়া

যদি কারোর হাইপোথাইরয়েডিজম থাকে তাহলে তার মধ্যেনিচেরলক্ষণগুলো দেখা দেয়-

. মানসিকবিষন্নতা

. মস্তিষ্কের ধোঁয়াশা বা মস্তিষ্ক যথাযথভাবে কাজ না করা

. কাজকর্ম করার ক্ষেত্রে অনীহা

. আলস্য দেখা দেওয়া

বিশেষজ্ঞদের মতে, থাইরয়েড সমস্যার চিকিৎসার পরে যেকোনও মানসিক অসুখের চিকিৎসা হওয়া উচিত বা পর্যায়ক্রমে এই দুটি সমস্যার চিকিৎসাই করা উচিত। তাই, এসব ক্ষেত্রে পরামর্শ হল যে কোনও মানসিক সমস্যার চিকিৎসার প্রস্তুতির আগে থাইরয়েডের বিষয়টা খতিয়ে দেখেনেওয়া জরুরি বা পাশাপাশি এই দুই সমস্যার চিকিৎসাই পর্যায়ক্রমে করা যায়। এক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানানো এবং তাদের  সাথে এই রোগের মানসিক স্বাস্থ্য সংশিষ্টতা নিয়ে আলোচনা করা উচিত তাতে করে পরিবারের সহযোগিতা পাওয়া সহজ হতে পারে। কেননা মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে হলে পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।

উপসংহারঃ

অসুস্থতা বলে কয়ে আসেনা তাই সাবধানতা প্রয়োজন। আর অসুস্থ হয়ে গেলে তা নিয়ন্ত্রণে বা নিবারনে মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।থাইরয়েডের অসুস্থতায় সুস্থ থাকতে নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন করা খুবই জরুরী সাথে প্রয়োজন চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত পরীক্ষা নিরীক্ষা করে যথাযথ মাত্রায় ঔষধ সেবন এবং শরীরচর্চা এবং মানসিক প্রশান্তি।